রবিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৩

গঙ্গা





অবশেষে চলেই এলামঠিক যেন চলে আসা নয়, এক প্রকার পালিয়ে আসাকার থেকে পালিয়ে এলাম আমি? বিদিশার কাছ থেকে? না কি নিজের থেকেই! স্পষ্ট নয়বিদিশা কিন্তু ভালো মেয়ে দেখতে শুনতে এক কথায় দারুণকাছে বেশিক্ষণ থাকলে যে পুড়ে মারা যেতে বেশি সময় লাগবে নাসেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়
সেই ভয়েই কি পালিয়ে আসা ! এর আগে তো এমন হয়নি কোনদিনআগেও বিদিশা কে নিয়ে ভিক্টোরিয়া ময়দানে গিয়েছিগাছের ছায়ায় আগুন আগুন খেলেছিকিন্তু এমন তো  হয়নি ! তবে আজ কেন এমন করে হাত ছুট হয়ে চলে এলাম ! বিদিশা নিশ্চয় অপমান বোধ করছে অপমান ওর সইবে না অন্য প্রত্যেক মেয়ের মতোইবেশ চলছিল চিত্রনাট্য খুব সুন্দর শুয়ে ছিলাম সবুজ ঘাসের বুকে পিঠ রেখেমাথাটা বিদিশার কোলেওর আঙ্গুল গুলো খেলা করছিল মাথার চুল ছুঁয়েবেশ ভালো লাগছিল, ভাবছিলাম সেই বড় বৌদির কথাতখন আমার দশ কি এগার হবেশিশু থেকে কিশোর হয়ে গেছি বলে মা তার কোল থেকে বহিষ্কার করে দিলেনআমি রাগ করতাম, বলতাম কেন মা? মা বলতেন খোকা বড় হয়ে গেছিসআর কি কোলে নিতে পারি? কেন নয় মা? ছেলেরা তো মায়ের কাছে চিরদিনই ছোট থাকেমা শুনতেন কিন্তু কোলে নিতেন নাফলে বিকল্প হিসেবে বৌদির কোলে গিয়ে পড়লামপ্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমি বসতাম , গান শুনাতামসে শুনত আর বলত - ভাই গান ছেড়ো না তুমিতার পর কবে কবে গান চলে গেল ! বৌদিও চলে গেছেনবড়দা আলাদা হয়ে গেছে, তার আলাদা সংসারএখন বাড়ি গেলে দেখি বৌদি আমায় যেন চিনতে পারে নাকথা বলতে হয় বলেন, যেটুকু না বললে নয় সেটুকুইমেজ বৌদির এখনও নতুন ভাব কাটেনিবোধহয় ওনার নতুন ভাব কাটার আগেই পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলা দেশও হয়ে যাবে স্বভাবগত ভাবেমা দুঃখ করে আজওকাঁদে বলে  - তিন ভাই এক থাকতে পারলি  না ! দুই হয়ে গেছিস , একদিন তিন হয়ে যাবি, আমি জানিআর এও আমাকে দেখে যেতে হবে মরার আগে !
আমি জানি - মানুষ থেকে মানুষের, ঘর থেকে ঘরের জন্ম আর হাঁড়ি থেকে হাঁড়িরআমার কাছে স্বাভাবিক খুবমা প্রায়ই বলতেন - ছোট খোকা, তুই কিছু কর এবারমেজদার বিয়ে হয়ে গেছে , আর বেশি দিন না, কে দেখবে তোকে বল? তুই এবার চাকরি খোঁজ একটা
 ফলে সিঁড়ি ভাঙ্গার ইচ্ছাটা রূপ নারায়ণের চরে দফন করে কলকাতা চলে এলামগ্রামের সেই একদল ছেলে, আড্ডার স্কুল মাঠ সব এখান থেকে অনেক দূরেযাওয়া যায় না আরতাই তারা সব এসে যায় এখানেই যখন তখনমাথা ঘিরে ধরে দস্যিপনায়তখন মাথাটা বিদিশার কোলেহটাত বিদিশা মুখ নামিয়ে আনলঠোঁটে ঠোঁটশরীর দিয়ে একটা লূ বয়ে গেল মুহূর্তেঅবশ হয়ে পালটা কামড় দিতে দিতে হাত উঠে যাচ্ছিল বিদিশার বুকেহারিয়ে যাচ্ছিলামকিন্তু কে যেন কানে কানে বলল পালা ... পুড়ে যাবি না হলে..পালাব্যাস, আর কোনও কথা নেইসোজা ইডেন এর পাশ দিয়ে হাঁটা দিলাম গঙ্গার দিকে
 নিজেকে বেশ মুক্ত মনে হলবিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়া কানের পাতায় সোঁ সোঁ বাজছেযেন মুছে দিচ্ছে একটু আগের চিত্রটাআমিও দাঁড়িয়ে রইলাম তিলোত্তমা কলকাতার মতপাহাড় প্রমাণ শহুরে আবর্জনা বুকে নিয়েও পবিত্র গঙ্গা! হ্যাঁ, তবু পবিত্র সে, মানুষের বিশ্বাসেঅতিশদা  বলেছিল, নদী আমাদের পথ দেখায় , নদী আমাদের ধর্ম শেখায় এই দেখ, দেখতে পাচ্ছিস ? পবিত্রতা? দেখা যাচ্ছে? ঘোলা জল, সভ্যতার নোংরা জঞ্জাল ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছিস? নাতবুও পবিত্র
আমি যখনই এই গঙ্গার পাড়ে আসি তখনই অতিশদা মুখটা মনে পড়ে কেবলযেন সে এভাবেই গম্ভীর ভাবে নদীকে দেখিয়ে বলছে নদী আমাদের পথ দেখায় ভালো কবিতা লিখতআমাদের কোম্পানিতেই চাকরি , পদে সিনিয়র হলেও সে আমার বন্ধুই ছিল সেখুব গান ভালবাসত, আর বোধহয় আমাকেওসিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও যেন মাটির মানুষএই ইট কাঠ পাথরের শহরে কি করে একটা মাটির মানুষ ফলল! মাটি থেকেই জন্ম নিত কবিতাকয়েকটা লিটল ম্যাগাজিনে ওর লেখা ছাপা হয়েছিলদারুণ লিখত, আর যাই লিখত, আমাকে পড়ে শোনাত সময় পেলেইএকদিন অফিসের পর একটা চায়ের দোকানে ঢুকেছি দুজনে, একটা কবিতা শোনাল সেআমি জিজ্ঞেস করলাম- তুমি কি করে এত সুন্দর লেখ বলো তো ?
- প্রেম করেছিস?  
- না, ওসব আমার দ্বারা হয় না ব্রাদার
- প্রেম কর আগে, তার পর নিজেই বুঝতে পারবি
            প্রেমিক কবি হয়? না কি কবিরাই আসলে প্রেমিক হয়? তা নিয়ে যথেষ্ট আমার দ্বন্দ্ব আছেএই দ্বন্দ্বটা বদ্ধমূল হয়েছিল ডায়েরিটা পুরো পড়ার পরকাকে যেন ভালো বাসতএত বন্ধুত্ব থাকলেও কোনোদিনও তার নামটা জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনিএমন কি , মেয়েটি ওকে ছেড়ে অন্য কারো সাথে জুড়ে গেছে দেখে যে কটা দিন বিধ্বস্ত হয়েছিল , তখনও জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি আমারতবু মাঝে মাঝে বলতাম, সে যদি তোমাকে ছাড়তে পারে, তুমি কেন পারছ না? এটা কি তোমার নিজের ব্যর্থতা নয়? সাথে এটাও বলেছিলাম শেষমেশ শুধু দিতে চাওয়াটাই শেষ কথা নয়যাকে দিতে চাইছ , তার নিতে পারাটাও একটা বিষয় অবশ্যইযেমন কুয়োর ব্যাং কে যদি তুমি তুমি সাগরের কথা বল, সে কিন্তু সাগর কে সওদাগরও শুনতে পারে
অতিশদা কোনও উত্তর করত না, শুধু উদাস হয়ে কোথায় হারিয়ে যেত, কি ভাবত এত তা আমিও জানতে পারতাম না, কিন্তু আমার নিজের মধ্যে একটা চঞ্চলতা টের পেতাম, মেয়েটিকে খুন করতে ইচ্ছে যেত
সেদিন সন্ধ্যায় বারে গেলাম, ড্যান্স বারএকপ্রকার জোর করে নিয়ে গিয়েছিলাম অতিশদাকেনদী দেখাতে, এক অন্য নদীমস্তি নদীনদী কি ভাবে বয়ে যায়, খানিকটা তার পুনর্মুল্যায়ন করতে একসাথে এক টেবিলে একজন সিনিয়রকে মাল খাওয়ার আমন্ত্রণ রেখেছিলাম, অতিশদা এমনিতে খেত না, কিন্তু সেদিন ওই নিয়েছিল সব থেকে বেশি পেগওদিকে তখন দম মারো দম... গাইছে আজকের এক হেলেনকিছু পাবলিক ঘোরে টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে তার দিকেআর আমার টেবিলে রোমিওদুটো যুগ চোখের সামনেওই ইউ আর মিশ্র প্রজাতির মেয়েদের ড্যান্স আর ব্যান্ড এর বীভৎস আওয়াজে কেউ টের পায়নি, একটা তেত্রিশ বছরের যুবক তার নিজেকে হারিয়ে কি অসহায় ভাবে টেবিলে মাথা ঠুকে কাঁদছেআমি কি করব! কি বলব! কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না, শুধু চুপ হয়ে বসে ছিলাম পাশের চেয়ারটাতেকেননা আমি জানতাম, মানুষ যখন কাঁদে, তাকে কাঁদতে দেওয়া ভালো, তাতে মন হাল্কা হয়
কিন্তু আমার ধারনা ভুল ছিলযে যার বাড়ি ফেরার পর প্রায় মধ্য রাত্রে একটা ম্যাসেজ এল মোবাইলে – ‘কাল চলে যাচ্ছি, তোর জন্যে একটা জিনিস রেখে যাচ্ছিসময়ে পেয়ে যাবিবাইআমি তখন অনলাইনে লাল নীল ছবি দেখছিলামম্যাসেজটা পেয়ে হতবাক, ওর কন্ডিশনটা বাস্তবে কেমন তা কিছু আগে পর্যন্ত দেখেছিকিছু ঢুকছিল না মাথায় আমারকোথায় যাচ্ছে ? ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম অনেক, কিন্তু প্রতিবারেই সুইচড অফ এল
পরদিন সকালে দশটায় একটা অজানা নম্বর থেকে কল এলতখন অফিসে সবে ঢুকছিআমি রিসিভ করলামওপাশে এক অজানা কণ্ঠস্বর, বলেছিল - বাবুঘাট থানা থেকে বলছি, লঞ্চ থেকে একটা ছেলে গঙ্গায় পড়ে গেছে, তার ব্যাগটা লঞ্চ থেকে পেয়েছি আমরাযদিও লাশটা এখনও পাওয়া যায়নিকিন্তু ব্যাগে একটা কবিতার বই ছিলতাতে এই নম্বরটা লেখা আছেআমরা মনে করি , ছেলেটা বোধ হয় আপনার পরিচিতযদি একবার থানায় আসেন, তো ভালো হয়
            হ্যাঁ, ওটা ওরই ব্যাগওটা নিয়েই অফিস আসত সে রোজ ক্ষিদিরপুরের কাছে বডিটা মেলে শেষেসবাই জানে এটা একটা নিছক দুর্ঘটনাভিড়ের চোটে একটা ছেলে পড়ে গেছে জলেপরদিন সকালের দৈনিক কাগজেও তেমনি লেখা হয়েছিলকোথাও লেখা হয়নি, কিম্বা কেউ বলেনি যে এটা দুর্ঘটনা নয়, আত্মহত্যা ছিল
কাপুরুষের মত পালিয়ে গেল, নদীতেনদী ওকে কোথায় নিয়ে গেল? কোন পথ দেখাল তবে? সে পথে বুঝি সবাই সাধু? সে গাঁয়ে বুঝি উজাড় হওয়ার ভয় নেই! জানি না আমিশুধু জানলাম, মানুষ কেমন নিজের কাছেই হেরে যায় অকস্মাৎ
অতিশদা আমার জন্যে একটা ডায়েরি রেখে গিয়েছিল ওর এক বান্ধবীর হাতেদুর্ঘটনার কয়েকদিন পর আমার অফিসের ঠিকানায় এক অজানা মেয়ে এসেছিলো সেটা দিতেসেই মেয়েটিই এই বিদিশাওর কাছ থেকেই জেনে ছিলাম,  যে মেয়েটিকে আমার খুন করতে ইচ্ছে হত, তার নাম শুক্লা, আর এও জেনেছিলাম, যে তাকে দেখলে মারা যায় না, মারা পড়তে হয়এমনি সে অপরূপাএকটি মেয়ের মুখে যখন আর একটি মেয়ের রূপের প্রশংসা পাওয়া যায় , তখন তাতে কোনও দ্বিমত থাকার জায়গা থাকে নাদেখেও ছিলাম কিছুদিন পরবিদিশার বান্ধবীদেখে মনে হয়নি, যে এই কদিন আগে ওর লীলা কাম খেলায় একটা প্রাণ ব্যালেন্স হারিয়ে গঙ্গায় ভেসে গেছেএখন সে দিব্যি ব্যস্ত আছে তার নতুন কাস্টমার কেয়ার অফিসে
শুক্লাকে নিয়ে একটা কৌতূহলী আমেজ মেটাতে মেটাতেই কবে কবে বিদিশার সাথে পরিচয়টা একটু ঘন হয়ে যায়আবার দেখতে দেখতেই তা পুরো জঙ্গল ছেয়ে গেলতায় বিদিশা ফুল দ্যাখে আর আমি তিনটা ভুল আঁকা কাঁচের বোতল দেখি শুধু ভাবে আমি ওকে ঠকাব নাআমার কিন্তু তেমন কোনও দায় নেইআমার কোনও প্রিয়জন বলে কিছু নেইশুধু প্রয়োজনএই পৃথিবী আসলে একটা গ্লোবাল মার্কেট, যেখানে আমরা সবাই ক্রেতা, আবার বিক্রেতাওএই কেনা বেচার মধ্যেই মুনাফা শব্দটা শেয়ার মার্কেটের ন্যায় ওঠা নামা করেযখন মুনাফা হয় না , তখন মনে হয় ঠকে গেলাম বা ক্ষতি হয়ে গেল আর সাথে সাথে ভুলেও যাই, গতকাল ছিল লক্ষ্মী বার , মুনাফার দিন এবং তা অন্য কাউকে ঠকিয়েইএভাবেই চলে আসছে আদি থেকে নদীবিদিশা , তুমি নিশ্চয় এই কদিন ফোন করবে না, দেখাও করবে নাকরিও না, এসবে আমার কিছু যায় আসে নাকিন্তু আমিই আবার তোমার কাছে আসবযখন প্যান্টের ভেতর চাপটা ফিরে আসবে আবার কোনও এক বিকেলে কিংবা  রাতেএমন কি সকালেও হতে পারেআমি জানি, তুমি ফেরাতে পারবে না, কারণ ওই প্রিয়তা হীন গ্লোবাল মার্কেট
অতিশদা যে ডায়েরীটা দিয়েছিল তাতে অনেক কবিতা আছেকবিতা হয়ত বা, হয়ত বা নয়আমি এসব কিছু বুঝিনা ভালো যতটা বুঝি ঘোড়ার আড়াই চালপ্রথম পৃষ্ঠায় একটা লেখা ছিল-
কিছুই দেখতে পাচ্ছি না যদিও কোটি কোটি প্রদীপ / জ্বলে আছে - দরজা খোলার শব্দ কে এল এত বেলা ? কেই বা গেল ?/ কার পড়ার টেবিলে এখনও গুন গুন আওয়াজ?/  বন্ধ হোক সব বন্ধ হোক , আর / আরও কিছু পরে রাত্রি গভীর হলে সে নির্ভয়ে বেরিয়ে আসুক এই আঁধারে / আমি ঘোর নিশীথে / যাবো অভিসারে
এটা আমাকে কিছু বিচলিত করেছিলএর বাইরে সত্যিই কি কিছু হওয়ার ছিল না? শরীর শরীর! যে কটা পাগল সমীকরণ ভেঙ্গে ছিল নতুন কিছুর খোঁজে সব কটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়েছে খাদেমোমবাতির মত পুড়ে পুড়ে খাটো হয়ে যায় আয়ুযেমন বিনয় কাকুর পরিবারকাকু মানুষ হিসেবে খারাপ নয় তো , খারাপ না বলাটা অন্যায় হবেবেশ সুন্দর , পাড়ার সবাই কাকুকে খুব মানে , কেননা কারো বিপদে আপদে সবার আগে কাকুকেই পাওয়া যায় আজওসেই কাকুর ঘরে কিন্তু রাত্রি রোজ বিদায় নেয় শাঁখের আওয়াজে না, কাকিমার কর্ষক চ্যাঁচামেচিতেদিন দিন এটাই ছিল নিয়তির মত অপ্রতিরোধ্যঅথচ যেদিন যৌবন ছিল ? সেদিনের গল্প এমন ছিল কি? না, একদম নাসেদিন তুমি আমি , আমি তুমিতে ভেসেছিল নৌকাআর আজ? আসলে শরীর, মন একটা মোড়ক কিংবা  শরীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোন বাধকতাবিনয় কাকুর বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির লাগোয়াআমি প্রতিদিন কাকিমার চেঁচামেচির স্বীকার হয়ে ঘুম ভাঙ্গা আলস্যেও স্পষ্ট দেখতে পেতাম এই সবসবই
সেই বায়োলজির টিউশনটা আজও মনে আছেতখন বর্ষাকাল, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি, টিউশনের রুমে আমি একা বসে আছি রাস্তার দিকে চেয়েকেউ আসছে নাবুঝলাম আজ আর কেউ আসবে না , এমন কি স্যার না, তবু এত বৃষ্টির মাঝে ফেরার চিন্তাটা নিতান্ত পাগলামো হততাই বসে ছিলাম চুপচাপহঠাৎ দেখি নন্দিতা আসছেনন্দিতা , স্কুলের দস্যু ছেলে-গুলোর মোস্ট ওয়ান্টেড গার্লসেই তাকে সুযোগ পেয়ে ছাড়বে কেন? তাই বেয়াড়া বৃষ্টি তাকে চুমু খেতে এতটুকু বিলম্ব করেনি, ছাতার শাসানি স্বত্বেও বৃষ্টি তাকে ভাসিয়েছে প্রেমিকি মেজাজেবেচারি পরি, ডানা পালক দিয়ে এল রাস্তার বৃষ্টিতে
 আমি হা করে দেখছিলাম ওকেসুন্দর ! না কি আগুন ! অবাক হয়ে দেখছিলাম আবার কিছু টা বেবাক হয়েওদেখলাম ছাতাটা বন্ধ করে টাঙ্গিয়ে রাখল চালার বাঁশের পেরেকেতারপর সামনে এসে দাঁড়ালআর একটু মুচকি হাসল যেটাতে ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, হয়ত আমাকে বোঝাতেই নানা এলোমেলো কথা বার্তার মাঝে লোড সেটিং হয়েছিলইংলিশ টিউশনে সেদিন বাধ্য হয়ে প্রথম বায়োলজি পড়লাম নন্দিতার সঞ্চালনে
মাসুল গুনতে হয়েছিল বেশকিছু দিনের মধ্যেই স্যার মানা করে দিলেনবলে দিলেন , সে আমাকে পড়াবে নাস্যারকে আর কিছু বলিনি, অন্য জায়গায় টিউশন নিলাম, কিন্তু প্রশ্ন ছিল? কেন? আর উত্তরের পিছনে দৌড় লাগিয়ে নাগাল পেলাম আট দশ দিন পরজানলাম নন্দিতার সাথে স্যারের পুরানো প্রেমআর সেদিনের বিকেলের ঘটনার পর নন্দিতা প্রাচীন সূত্র মোতাবেক ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছিল আমার দিকেনতুন কিছু সব সময়ই টানেফলত আমি হলাম স্যার এর প্রতিযোগী ! কে আর প্রতিযোগীকে কে সহ্য করে! অতএব হটাও
নন্দিতা কিছু যেন বলতে চেয়ে ডেকেছিল এক দিন স্কুল ছুটির পরযাইনিযেতে পারতাম, কিন্তু যাইনিইতিমধ্যে সোমাকে চিঠি দেওয়ার অপরাধে স্কুল কর্তৃপক্ষ টি সি দিয়েছিল হেমন্তকে ম্যানেজিং কমেটির মিটিং করেঅপমান সইতে পারেনি তাই রেল লাইন বেছে নিয়েছিল সেদিনেইগত পরীক্ষার লেটার মার্কস গুলো হঠাৎ পিঁপড়ে হয়ে খেয়েছিল ছিন্ন বিচ্ছিন্ন রক্তপিণ্ডওর মা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেনআর বাবা বলছিলেন , ছেলেটা বড্ড সেন্টিমেন্টাল , সইতে পারল নারে প্রনবেশঅলোক এখনও জেলে জয়শ্রীকে নিয়ে পালিয়েছিলপেছনে জয়শ্রীর বাবার লেলিয়ে দেওয়া কুকুর পুলিশ যখন ধরল, জয়শ্রী বেমালুম ভুলে গেল বলতে যে সে প্রাপ্ত বয়স্কা , সে স্বেচ্ছায় এসেছে, অতএব প্রেম নয়, অপহরণপ্রেমিক নয়, হল ধর্ষণকারী , ফলে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে, ধুমধামে আবার অন্য ঘরে গেলমেয়েকেলা সমাজ সংবিধানের দৌলতে অলোক গেল শ্রীঘরেএকবার দেখা করতে গিয়েছিলাম, লোহার বেড়ার ওপাশ থেকে হাতদুটো বাড়িয়ে আমার হাত ধরে বলেছিল কথা দে প্রনবেশ, কাউকে বিশ্বাস করবি নাকথা দে
এরপরও আমি ভালোবাসব বিদিশা? আমিও কি শুধু খিদে মেটানোর জন্য ভালোবাসি বলব তোমার মত? এখনও এই এতদূর এসে এই সময় সেক্স করার জন্য ভালোবাসার আশ্রয় নেওয়াটা এক প্রকার ছলনা নয় কি? ক্ষতি কি যদি বলি আজকে একটু ইয়ে করতে চাই তোমার সাথে , মানে সেক্সকিছু দেওয়া নেওয়াতাতে মিথ্যাচারণ হয় না অন্ততযাইহোক আমি ভালোবাসতে পারব না বিদিশা, কেন না আমি অতিশ নইওসব আমার জন্য নয়আমার পথ রাজ পথের নিয়ন আলোর রাত্রি টুকুআমার পথ খোলস ছাড়া আগুনের শয্যাকোন ফুলের শয্যা নয়, এবং সেখানেই আমি সাবলীলঅতিশদা , হেমন্ত,  অলোক, এরা আমার বন্ধু ছিলতুমি জান না , এই নদী জানে সব, তাই দ্যাখো না কেমন চুপ চাপ বয়ে চলেছে এই যে আমি এত জঞ্জাল ভাসাচ্ছি পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে , দ্যাখো, নদী কিন্তু কিছু বলছে নাদ্যাখো কেমন নীরবে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেনদী কি আমাকে চোখ রাঙ্গাতে পারত না! বলতে পারত না! যে এই লম্পট , কি যা তা বলছিস তুই ? পারতকিন্তু বলবে নাকেননা তো আমার চেয়েও লক্ষ গুন বেশি দেখেছেদেখে আসছে
 কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? সামনেই মিলেনিয়াম পার্কডান দিকেওই তো , দেখা যাচ্ছেওখানে গিয়ে  বসলে ভালো হয়এই গোধূলি মরসুমে কি রকম এক আশ্চর্য রূপ খেলা করছে জলের বুকেআলতো আলতো দুলছে পড়ন্ত সূর্য রঙআমি অপলক তাকিয়ে আছি সেই দোলার দিকে
- তুমি বাসায় ফিরবে না?
যেন ধ্যান ভঙ্গ হল আমার, পাশে যে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে , আমি বুঝতেই পারিনিসাথে সাথে আশ্চর্য হলাম, আমি যে এখানে এসেছি , বিদিশা জানল কি করে?
- কি ভাবছ এত? তুমি কি রাগ করেছ কোন আমার উপর ?
আমার কিছু বলার ছিল নাশুধু জলের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে বললাম, - অতিশদা এই জলেই ডুবে ছিলতাই না! আজ এক মাস হয়ে গেল !
- হুঁ, কে জানে কি করে একটা যুবক ছেলে লঞ্চ থেকে পড়ে যায় ! নেশা টেশা করত নাকি কে জানে !
 - পড়ে যায় নিস্বেচ্ছায় চলে গেছেআর নেশাও করত তবে সেটা আমাদের মত নাসেটা ভালোবাসার নেশাথৈ হারিয়ে ফেলল শেষে ...
- মানে? তুমি কি বলছ? সুইসাইড? বিদিশা অবাক হল খুব
- না, না, কিছু না ওসবছাড়ো

আমি থামিয়ে দিলাম বিষয় টাকে, পকেট থেকে একটা সিগারেট বেরিয়ে এসে আগুন চাইছে মুখেদিলামতারপর গাল ভরে ধুঁয়া মুক্ত করতে করতে দুজনে হাঁটতে লাগলাম পাশাপাশিবিদিশা পুরো চুপচাপরাগ কিংবা অভিমান, কোনটারই তেমন কিছু অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে নাআমি পালিয়ে আসার পর খুঁজতে খুঁজতে হেতা পর্যন্ত এসে গেছে ! কি করে জানল , যে আমি এখানে এসেছি! মনে পড়ছে, ভিক্টোরিয়া তে ঢুকার আগেই আমি বলেছিলাম, আজ একটু গঙ্গা তীরে যাবোতীর বরাবর হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম জল থমথমে হয়ে গেছে বোধহয় জোয়ার আসছেহ্যাঁ, তাইহাল্কা বোঝা যাচ্ছে জল উলটো প্রবাহে যাচ্ছে ধীরে ধীরেআমি হাসলামআজ থেকে মাস দুয়েক আগে লোকটা বলেছিল- নদী আমাদের পথ শেখায়বিদিশা হালকা করে হাতটা ধরেছে আমিওমনে মনে বলছি -  বিদিশা, ভুল করছআমি অতিশ নইতুমি চাইলে আমার মত একটা ছেলেকে কেন, স্বয়ং দেবতাকেও বস করতে পারোতোমার শরীর  এতই মায়াবীকিন্তু তুমি জাননা , এই হাত শুধু হাতের নামে ধরাএই যে জোয়ার দেখছ, এটা জোয়ার, জোয়ার চিরদিনের হয় না।