অবশেষে চলেই এলাম। ঠিক যেন চলে আসা নয়, এক প্রকার পালিয়ে আসা। কার থেকে পালিয়ে এলাম আমি? বিদিশার কাছ থেকে? না কি নিজের থেকেই! স্পষ্ট নয় । বিদিশা কিন্তু ভালো মেয়ে । দেখতে শুনতে এক কথায় দারুণ। কাছে বেশিক্ষণ থাকলে যে পুড়ে মারা যেতে বেশি সময় লাগবে না। সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায় ।
সেই ভয়েই কি পালিয়ে আসা ! এর আগে তো এমন হয়নি কোনদিন । আগেও বিদিশা কে নিয়ে ভিক্টোরিয়া ময়দানে গিয়েছি। গাছের ছায়ায় আগুন আগুন খেলেছি । কিন্তু এমন তো হয়নি ! তবে আজ কেন এমন করে হাত ছুট হয়ে চলে এলাম ! বিদিশা নিশ্চয় অপমান বোধ করছে। এ অপমান ওর সইবে না অন্য প্রত্যেক মেয়ের মতোই। বেশ চলছিল চিত্রনাট্য । খুব সুন্দর শুয়ে ছিলাম সবুজ ঘাসের বুকে পিঠ রেখে। মাথাটা বিদিশার কোলে । ওর আঙ্গুল গুলো খেলা করছিল মাথার চুল ছুঁয়ে । বেশ ভালো লাগছিল, ভাবছিলাম সেই বড় বৌদির কথা। তখন আমার দশ কি এগার হবে। শিশু থেকে কিশোর হয়ে গেছি বলে মা তার কোল থেকে বহিষ্কার করে দিলেন। আমি রাগ করতাম, বলতাম – কেন মা? মা বলতেন – খোকা বড় হয়ে গেছিস। আর কি কোলে নিতে পারি? কেন নয় মা? ছেলেরা তো মায়ের কাছে চিরদিনই ছোট থাকে। মা শুনতেন কিন্তু কোলে নিতেন না। ফলে বিকল্প হিসেবে বৌদির কোলে গিয়ে পড়লাম । প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমি বসতাম , গান শুনাতাম । সে শুনত আর বলত - ভাই গান ছেড়ো না তুমি। তার পর কবে কবে গান চলে গেল ! বৌদিও চলে গেছেন। বড়দা আলাদা হয়ে গেছে, তার আলাদা সংসার। এখন বাড়ি গেলে দেখি বৌদি আমায় যেন চিনতে পারে না। কথা বলতে হয় বলেন, যেটুকু না বললে নয় সেটুকুই । মেজ বৌদির এখনও নতুন ভাব কাটেনি। বোধহয় ওনার নতুন ভাব কাটার আগেই পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলা দেশও হয়ে যাবে স্বভাবগত ভাবে । মা দুঃখ করে আজও । কাঁদে । বলে - তিন ভাই এক থাকতে পারলি না ! দুই হয়ে গেছিস , একদিন তিন হয়ে যাবি, আমি জানি। আর এও আমাকে দেখে যেতে হবে মরার আগে !
আমি ও জানি - মানুষ থেকে মানুষের, ঘর থেকে ঘরের জন্ম আর হাঁড়ি থেকে হাঁড়ির। আমার কাছে স্বাভাবিক খুব । মা প্রায়ই বলতেন - ছোট খোকা, তুই কিছু কর এবার। মেজদার বিয়ে হয়ে গেছে , আর বেশি দিন না, কে দেখবে তোকে বল? তুই এবার চাকরি খোঁজ একটা ।
ফলে সিঁড়ি ভাঙ্গার ইচ্ছাটা রূপ নারায়ণের চরে দফন করে কলকাতা চলে এলাম। গ্রামের সেই একদল ছেলে, আড্ডার স্কুল মাঠ সব এখান থেকে অনেক দূরে । যাওয়া যায় না আর। তাই তারা সব এসে যায় এখানেই যখন তখন । মাথা ঘিরে ধরে দস্যিপনায় । তখন মাথাটা বিদিশার কোলে। হটাত বিদিশা মুখ নামিয়ে আনল । ঠোঁটে ঠোঁট । শরীর দিয়ে একটা লূ বয়ে গেল মুহূর্তে । অবশ হয়ে পালটা কামড় দিতে দিতে হাত উঠে যাচ্ছিল বিদিশার বুকে। হারিয়ে যাচ্ছিলাম । কিন্তু কে যেন কানে কানে বলল – পালা ...
পুড়ে যাবি না হলে..পালা । ব্যাস, আর কোনও কথা নেই। সোজা ইডেন এর পাশ দিয়ে হাঁটা দিলাম গঙ্গার দিকে ।
নিজেকে বেশ মুক্ত মনে হল। বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়া কানের পাতায় সোঁ সোঁ বাজছে । যেন মুছে দিচ্ছে একটু আগের চিত্রটা । আমিও দাঁড়িয়ে রইলাম তিলোত্তমা কলকাতার মত । পাহাড় প্রমাণ শহুরে আবর্জনা বুকে নিয়েও পবিত্র গঙ্গা! হ্যাঁ, তবু পবিত্র সে, মানুষের বিশ্বাসে। অতিশদা বলেছিল, নদী আমাদের পথ দেখায় , নদী আমাদের ধর্ম শেখায়। এই দেখ, দেখতে পাচ্ছিস ? পবিত্রতা? দেখা যাচ্ছে? ঘোলা জল, সভ্যতার নোংরা জঞ্জাল ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছিস? না। তবুও পবিত্র ।
আমি যখনই এই গঙ্গার পাড়ে আসি তখনই অতিশদা’র মুখটা মনে পড়ে কেবল। যেন সে এভাবেই গম্ভীর ভাবে নদীকে দেখিয়ে বলছে – নদী আমাদের পথ দেখায় । ও ভালো কবিতা লিখত। আমাদের কোম্পানিতেই চাকরি , পদে সিনিয়র হলেও সে আমার বন্ধুই ছিল সে । খুব গান ভালবাসত, আর বোধহয় আমাকেও । সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও যেন মাটির মানুষ । এই ইট কাঠ পাথরের শহরে কি করে একটা মাটির মানুষ ফলল! মাটি থেকেই জন্ম নিত কবিতা। কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিনে ওর লেখা ছাপা হয়েছিল। দারুণ লিখত, আর যাই লিখত, আমাকে পড়ে শোনাত সময় পেলেই । একদিন অফিসের পর একটা চায়ের দোকানে ঢুকেছি দুজনে, একটা কবিতা শোনাল সে । আমি জিজ্ঞেস করলাম- তুমি কি করে এত সুন্দর লেখ বলো তো ?
- প্রেম করেছিস?
- না, ওসব আমার দ্বারা হয় না ব্রাদার ।
- প্রেম কর আগে, তার পর নিজেই বুঝতে পারবি।
প্রেমিক কবি হয়? না কি কবিরাই আসলে প্রেমিক হয়? তা নিয়ে যথেষ্ট আমার দ্বন্দ্ব আছে। এই দ্বন্দ্বটা বদ্ধমূল হয়েছিল ডায়েরিটা পুরো পড়ার পর । কাকে যেন ভালো বাসত। এত বন্ধুত্ব থাকলেও কোনোদিনও তার নামটা জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি। এমন কি , মেয়েটি ওকে ছেড়ে অন্য কারো সাথে জুড়ে গেছে দেখে যে কটা দিন বিধ্বস্ত হয়েছিল , তখনও জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি আমার । তবু মাঝে মাঝে বলতাম, সে যদি তোমাকে ছাড়তে পারে, তুমি কেন পারছ না? এটা কি তোমার নিজের ব্যর্থতা নয়? সাথে এটাও বলেছিলাম শেষমেশ –শুধু দিতে চাওয়াটাই শেষ কথা নয়। যাকে দিতে চাইছ , তার নিতে পারাটাও একটা বিষয় অবশ্যই। যেমন কুয়োর ব্যাং কে যদি তুমি তুমি সাগরের কথা বল, সে কিন্তু সাগর কে সওদাগরও শুনতে পারে।
অতিশদা কোনও উত্তর করত না, শুধু উদাস হয়ে কোথায় হারিয়ে যেত, কি ভাবত এত তা আমিও জানতে পারতাম না, কিন্তু আমার নিজের মধ্যে একটা চঞ্চলতা টের পেতাম, মেয়েটিকে খুন করতে ইচ্ছে যেত ।
সেদিন সন্ধ্যায় বারে গেলাম, ড্যান্স বার। একপ্রকার জোর করে নিয়ে গিয়েছিলাম অতিশদাকে । নদী দেখাতে, এ এক অন্য নদী । মস্তি নদী । নদী কি ভাবে বয়ে যায়, খানিকটা তার পুনর্মুল্যায়ন করতে । একসাথে এক টেবিলে একজন সিনিয়রকে মাল খাওয়ার আমন্ত্রণ রেখেছিলাম, অতিশদা এমনিতে খেত না, কিন্তু সেদিন ওই নিয়েছিল সব থেকে বেশি পেগ। ওদিকে তখন দম মারো দম...
গাইছে আজকের এক হেলেন । কিছু পাবলিক ঘোরে টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে তার দিকে । আর আমার টেবিলে রোমিও । দুটো যুগ চোখের সামনে । ওই ইউ আর এ’র মিশ্র প্রজাতির মেয়েদের ড্যান্স আর ব্যান্ড এর বীভৎস আওয়াজে কেউ টের পায়নি, একটা তেত্রিশ বছরের যুবক তার নিজেকে হারিয়ে কি অসহায় ভাবে টেবিলে মাথা ঠুকে কাঁদছে। আমি কি করব! কি বলব! কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না, শুধু চুপ হয়ে বসে ছিলাম পাশের চেয়ারটাতে । কেননা আমি জানতাম, মানুষ যখন কাঁদে, তাকে কাঁদতে দেওয়া ভালো, তাতে মন হাল্কা হয় ।
কিন্তু আমার ধারনা ভুল ছিল। যে যার বাড়ি ফেরার পর প্রায় মধ্য রাত্রে একটা ম্যাসেজ এল মোবাইলে – ‘কাল চলে যাচ্ছি, তোর জন্যে একটা জিনিস রেখে যাচ্ছি। সময়ে পেয়ে যাবি। বাই। আমি তখন অনলাইনে লাল নীল ছবি দেখছিলাম । ম্যাসেজটা পেয়ে হতবাক, ওর কন্ডিশনটা বাস্তবে কেমন তা কিছু আগে পর্যন্ত দেখেছি । কিছু ঢুকছিল না মাথায় আমার। কোথায় যাচ্ছে ও ? ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম অনেক, কিন্তু প্রতিবারেই সুইচড অফ এল ।
পরদিন সকালে দশটায় একটা অজানা নম্বর থেকে কল এল। তখন অফিসে সবে ঢুকছি। আমি রিসিভ করলাম। ওপাশে এক অজানা কণ্ঠস্বর, বলেছিল - বাবুঘাট থানা থেকে বলছি, লঞ্চ থেকে একটা ছেলে গঙ্গায় পড়ে গেছে, তার ব্যাগটা লঞ্চ থেকে পেয়েছি আমরা। যদিও লাশটা এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু ব্যাগে একটা কবিতার বই ছিল। তাতে এই নম্বরটা লেখা আছে। আমরা মনে করি , ছেলেটা বোধ হয় আপনার পরিচিত। যদি একবার থানায় আসেন, তো ভালো হয় ।
হ্যাঁ, ওটা ওরই ব্যাগ। ওটা নিয়েই অফিস আসত সে রোজ । ক্ষিদিরপুরের কাছে বডিটা মেলে শেষে। সবাই জানে এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা। ভিড়ের চোটে একটা ছেলে পড়ে গেছে জলে। পরদিন সকালের দৈনিক কাগজেও তেমনি লেখা হয়েছিল। কোথাও লেখা হয়নি, কিম্বা কেউ বলেনি যে এটা দুর্ঘটনা নয়, আত্মহত্যা ছিল।
কাপুরুষের মত পালিয়ে গেল, নদীতে । নদী ওকে কোথায় নিয়ে গেল? কোন পথ দেখাল তবে? সে পথে বুঝি সবাই সাধু? সে গাঁয়ে বুঝি উজাড় হওয়ার ভয় নেই! জানি না আমি। শুধু জানলাম, মানুষ কেমন নিজের কাছেই হেরে যায় অকস্মাৎ ।
অতিশদা আমার জন্যে একটা ডায়েরি রেখে গিয়েছিল ওর এক বান্ধবীর হাতে। দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর আমার অফিসের ঠিকানায় এক অজানা মেয়ে এসেছিলো সেটা দিতে । সেই মেয়েটিই এই বিদিশা । ওর কাছ থেকেই জেনে ছিলাম, যে মেয়েটিকে আমার খুন করতে ইচ্ছে হত, তার নাম শুক্লা, আর এও জেনেছিলাম, যে তাকে দেখলে মারা যায় না, মারা পড়তে হয়। এমনি সে অপরূপা। একটি মেয়ের মুখে যখন আর একটি মেয়ের রূপের প্রশংসা পাওয়া যায় , তখন তাতে কোনও দ্বিমত থাকার জায়গা থাকে না। দেখেও ছিলাম কিছুদিন পর। বিদিশার বান্ধবী। দেখে মনে হয়নি, যে এই কদিন আগে ওর লীলা কাম খেলায় একটা প্রাণ ব্যালেন্স হারিয়ে গঙ্গায় ভেসে গেছে । এখন সে দিব্যি ব্যস্ত আছে তার নতুন কাস্টমার কেয়ার অফিসে।
শুক্লাকে নিয়ে একটা কৌতূহলী আমেজ মেটাতে মেটাতেই কবে কবে বিদিশার সাথে পরিচয়টা একটু ঘন হয়ে যায়। আবার দেখতে দেখতেই তা পুরো জঙ্গল ছেয়ে গেল। তায় বিদিশা ফুল দ্যাখে আর আমি তিনটা ভুল আঁকা কাঁচের বোতল দেখি শুধু । ও ভাবে আমি ওকে ঠকাব না। আমার কিন্তু তেমন কোনও দায় নেই। আমার কোনও প্রিয়জন বলে কিছু নেই। শুধু প্রয়োজন । এই পৃথিবী আসলে একটা গ্লোবাল মার্কেট, যেখানে আমরা সবাই ক্রেতা, আবার বিক্রেতাও। এই কেনা বেচার মধ্যেই মুনাফা শব্দটা শেয়ার মার্কেটের ন্যায় ওঠা নামা করে। যখন মুনাফা হয় না , তখন মনে হয় ঠকে গেলাম বা ক্ষতি হয়ে গেল আর সাথে সাথে ভুলেও যাই, গতকাল ছিল লক্ষ্মী বার , মুনাফার দিন এবং তা অন্য কাউকে ঠকিয়েই। এভাবেই চলে আসছে আদি থেকে নদী। বিদিশা , তুমি নিশ্চয় এই কদিন ফোন করবে না, দেখাও করবে না। করিও না, এসবে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমিই আবার তোমার কাছে আসব। যখন প্যান্টের ভেতর চাপটা ফিরে আসবে আবার কোনও এক বিকেলে কিংবা রাতে। এমন কি সকালেও হতে পারে। আমি জানি, তুমি ফেরাতে পারবে না, কারণ ওই প্রিয়তা হীন গ্লোবাল মার্কেট।
অতিশদা যে ডায়েরীটা দিয়েছিল তাতে অনেক কবিতা আছে। কবিতা হয়ত বা, হয়ত বা নয়। আমি এসব কিছু বুঝিনা ভালো যতটা বুঝি ঘোড়ার আড়াই চাল । প্রথম পৃষ্ঠায় একটা লেখা ছিল-
‘কিছুই দেখতে পাচ্ছি না যদিও কোটি কোটি প্রদীপ / জ্বলে আছে - দরজা খোলার শব্দ কে এল এত বেলা ? কেই বা গেল ?/ কার পড়ার টেবিলে এখনও গুন গুন আওয়াজ?/ বন্ধ হোক সব বন্ধ হোক , আর / আরও কিছু পরে রাত্রি গভীর হলে সে নির্ভয়ে বেরিয়ে আসুক এই আঁধারে / আমি ঘোর নিশীথে / যাবো অভিসারে ।’
এটা আমাকে কিছু বিচলিত করেছিল । এর বাইরে সত্যিই কি কিছু হওয়ার ছিল না? শরীর শরীর! যে কটা পাগল সমীকরণ ভেঙ্গে ছিল নতুন কিছুর খোঁজে সব কটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়েছে খাদে । মোমবাতির মত পুড়ে পুড়ে খাটো হয়ে যায় আয়ু। যেমন বিনয় কাকুর পরিবার। কাকু মানুষ হিসেবে খারাপ নয় তো , খারাপ না বলাটা অন্যায় হবে। বেশ সুন্দর , পাড়ার সবাই কাকুকে খুব মানে , কেননা কারো বিপদে আপদে সবার আগে কাকুকেই পাওয়া যায় আজও । সেই কাকুর ঘরে কিন্তু রাত্রি রোজ বিদায় নেয় শাঁখের আওয়াজে না, কাকিমার কর্ষক চ্যাঁচামেচিতে । দিন দিন এটাই ছিল নিয়তির মত অপ্রতিরোধ্য । অথচ যেদিন যৌবন ছিল ? সেদিনের গল্প এমন ছিল কি? না, একদম না। সেদিন তুমি আমি , আমি তুমিতে ভেসেছিল নৌকা। আর আজ? আসলে শরীর, মন একটা মোড়ক কিংবা শরীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোন বাধকতা। বিনয় কাকুর বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির লাগোয়া । আমি প্রতিদিন কাকিমার চেঁচামেচির স্বীকার হয়ে ঘুম ভাঙ্গা আলস্যেও স্পষ্ট দেখতে পেতাম এই সব। সবই।
সেই বায়োলজির টিউশনটা আজও মনে আছে । তখন বর্ষাকাল, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি, টিউশনের রুমে আমি একা বসে আছি রাস্তার দিকে চেয়ে । কেউ আসছে না । বুঝলাম আজ আর কেউ আসবে না , এমন কি স্যার ও না, তবু এত বৃষ্টির মাঝে ফেরার চিন্তাটা নিতান্ত পাগলামো হত। তাই বসে ছিলাম চুপচাপ। হঠাৎ দেখি নন্দিতা আসছে । নন্দিতা , স্কুলের দস্যু ছেলে-গুলোর মোস্ট ওয়ান্টেড গার্ল। সেই তাকে সুযোগ পেয়ে ছাড়বে কেন? তাই বেয়াড়া বৃষ্টি তাকে চুমু খেতে এতটুকু বিলম্ব করেনি, ছাতার শাসানি স্বত্বেও বৃষ্টি তাকে ভাসিয়েছে প্রেমিকি মেজাজে । বেচারি পরি, ডানা পালক দিয়ে এল রাস্তার বৃষ্টিতে ।
আমি হা করে দেখছিলাম ওকে। সুন্দর ! না কি আগুন ! অবাক হয়ে দেখছিলাম আবার কিছু টা বেবাক হয়েও । দেখলাম ও ছাতাটা বন্ধ করে টাঙ্গিয়ে রাখল চালার বাঁশের পেরেকে । তারপর সামনে এসে দাঁড়াল । আর একটু মুচকি হাসল যেটাতে ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, হয়ত আমাকে বোঝাতেই নানা এলোমেলো কথা বার্তার মাঝে লোড সেটিং হয়েছিল । ইংলিশ টিউশনে সেদিন বাধ্য হয়ে প্রথম বায়োলজি পড়লাম নন্দিতার সঞ্চালনে ।
মাসুল গুনতে হয়েছিল বেশ। কিছু দিনের মধ্যেই স্যার মানা করে দিলেন। বলে দিলেন , সে আমাকে পড়াবে না। স্যারকে আর কিছু বলিনি, অন্য জায়গায় টিউশন নিলাম, কিন্তু প্রশ্ন ছিল? কেন? আর উত্তরের পিছনে দৌড় লাগিয়ে নাগাল পেলাম আট দশ দিন পর । জানলাম নন্দিতার সাথে স্যারের পুরানো প্রেম । আর সেদিনের বিকেলের ঘটনার পর নন্দিতা প্রাচীন সূত্র মোতাবেক ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছিল আমার দিকে। নতুন কিছু সব সময়ই টানে । ফলত আমি হলাম স্যার এর প্রতিযোগী ! কে আর প্রতিযোগীকে কে সহ্য করে! অতএব হটাও ।
নন্দিতা কিছু যেন বলতে চেয়ে ডেকেছিল এক দিন স্কুল ছুটির পর । যাইনি । যেতে পারতাম, কিন্তু যাইনি । ইতিমধ্যে সোমাকে চিঠি দেওয়ার অপরাধে স্কুল কর্তৃপক্ষ টি সি দিয়েছিল হেমন্তকে ম্যানেজিং কমেটির মিটিং করে । অপমান সইতে পারেনি তাই রেল লাইন বেছে নিয়েছিল সেদিনেই । গত পরীক্ষার লেটার মার্কস গুলো হঠাৎ পিঁপড়ে হয়ে খেয়েছিল ছিন্ন বিচ্ছিন্ন রক্তপিণ্ড । ওর মা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। আর বাবা বলছিলেন , ছেলেটা বড্ড সেন্টিমেন্টাল , সইতে পারল নারে প্রনবেশ । অলোক এখনও জেলে । জয়শ্রীকে নিয়ে পালিয়েছিল । পেছনে জয়শ্রীর বাবার লেলিয়ে দেওয়া কুকুর পুলিশ যখন ধরল, জয়শ্রী বেমালুম ভুলে গেল বলতে যে সে প্রাপ্ত বয়স্কা , সে স্বেচ্ছায় এসেছে, অতএব প্রেম নয়, অপহরণ। প্রেমিক নয়, হল ধর্ষণকারী , ফলে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে, ধুমধামে আবার অন্য ঘরে গেল। মেয়েকেলা সমাজ সংবিধানের দৌলতে অলোক গেল শ্রীঘরে । একবার দেখা করতে গিয়েছিলাম, লোহার বেড়ার ওপাশ থেকে হাতদুটো বাড়িয়ে আমার হাত ধরে বলেছিল – কথা দে প্রনবেশ, কাউকে বিশ্বাস করবি না। কথা দে।
এরপরও আমি ভালোবাসব বিদিশা? আমিও কি শুধু খিদে মেটানোর জন্য ভালোবাসি বলব তোমার মত? এখনও এই এতদূর এসে এই সময় সেক্স করার জন্য ভালোবাসার আশ্রয় নেওয়াটা এক প্রকার ছলনা নয় কি? ক্ষতি কি যদি বলি আজকে একটু ইয়ে করতে চাই তোমার সাথে , মানে সেক্স । কিছু দেওয়া নেওয়া । তাতে মিথ্যাচারণ হয় না অন্তত । যাইহোক আমি ভালোবাসতে পারব না বিদিশা, কেন না আমি অতিশ নই। ওসব আমার জন্য নয়। আমার পথ রাজ পথের নিয়ন আলোর রাত্রি টুকু । আমার পথ খোলস ছাড়া আগুনের শয্যা, কোন ফুলের শয্যা নয়, এবং সেখানেই আমি সাবলীল। অতিশদা , হেমন্ত, অলোক, এরা আমার বন্ধু ছিল। তুমি জান না , এই নদী জানে সব, তাই দ্যাখো না কেমন চুপ চাপ বয়ে চলেছে । এই যে আমি এত জঞ্জাল ভাসাচ্ছি পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে , দ্যাখো, নদী কিন্তু কিছু বলছে না। দ্যাখো কেমন নীরবে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে । নদী কি আমাকে চোখ রাঙ্গাতে পারত না! বলতে পারত না! যে – এই লম্পট , কি যা তা বলছিস তুই ? পারত। কিন্তু বলবে না । কেননা ও তো আমার চেয়েও লক্ষ গুন বেশি দেখেছে । দেখে আসছে ।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? সামনেই মিলেনিয়াম পার্ক। ডান দিকে । ওই তো , দেখা যাচ্ছে। ওখানে গিয়ে বসলে ভালো হয়। এই গোধূলি মরসুমে কি রকম এক আশ্চর্য রূপ খেলা করছে জলের বুকে। আলতো আলতো দুলছে পড়ন্ত সূর্য রঙ । আমি অপলক তাকিয়ে আছি সেই দোলার দিকে ।
- তুমি বাসায় ফিরবে না?
যেন ধ্যান ভঙ্গ হল আমার, পাশে যে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে , আমি বুঝতেই পারিনি। সাথে সাথে আশ্চর্য ও হলাম, আমি যে এখানে এসেছি , বিদিশা জানল কি করে?
- কি ভাবছ এত? তুমি কি রাগ করেছ কোন আমার উপর ?
আমার কিছু বলার ছিল না। শুধু জলের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে বললাম, -
অতিশদা এই জলেই ডুবে ছিল । তাই না! আজ এক মাস হয়ে গেল !
- হুঁ, কে জানে কি করে একটা যুবক ছেলে লঞ্চ থেকে পড়ে যায় ! নেশা টেশা করত নাকি কে জানে !
- পড়ে যায় নি। স্বেচ্ছায় চলে গেছে । আর ও নেশাও করত তবে সেটা আমাদের মত না। সেটা ভালোবাসার নেশা । থৈ হারিয়ে ফেলল শেষে ...
- মানে? তুমি কি বলছ? সুইসাইড? বিদিশা অবাক হল খুব ।
- না, না, কিছু না ওসব। ছাড়ো ।
আমি থামিয়ে দিলাম বিষয় টাকে, পকেট থেকে একটা সিগারেট বেরিয়ে এসে আগুন চাইছে মুখে। দিলাম। তারপর গাল ভরে ধুঁয়া মুক্ত করতে করতে দুজনে হাঁটতে লাগলাম পাশাপাশি। বিদিশা পুরো চুপচাপ। রাগ কিংবা অভিমান, কোনটারই তেমন কিছু অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। আমি পালিয়ে আসার পর খুঁজতে খুঁজতে হেতা পর্যন্ত এসে গেছে ! কি করে জানল ও, যে আমি এখানে এসেছি! মনে পড়ছে, ভিক্টোরিয়া তে ঢুকার আগেই আমি বলেছিলাম, আজ একটু গঙ্গা তীরে যাবো। তীর বরাবর হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম জল থমথমে হয়ে গেছে । বোধহয় জোয়ার আসছে । হ্যাঁ, তাই। হাল্কা বোঝা যাচ্ছে জল উলটো প্রবাহে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমি হাসলাম । আজ থেকে মাস দুয়েক আগে লোকটা বলেছিল- নদী আমাদের পথ শেখায়। বিদিশা হালকা করে হাতটা ধরেছে । আমিও । মনে মনে বলছি - বিদিশা, ভুল করছ। আমি অতিশ নই। তুমি চাইলে আমার মত একটা ছেলেকে কেন, স্বয়ং দেবতাকেও বস করতে পারো। তোমার শরীর এতই মায়াবী। কিন্তু তুমি জাননা , এই হাত শুধু হাতের নামে ধরা। এই যে জোয়ার দেখছ, এটা জোয়ার, জোয়ার চিরদিনের হয় না।